You can use WP menu builder to build menus

অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান রিজভিঃ- আবারও প্রতিবাদ করে আলোচনার জন্ম দিলেন নওগাঁ-৬ আসনের এমপি প্রখ্যাত শ্রমিকনেতা ইসরাফিল আলম। সম্প্রতি বাজেট পাসের দিন অর্থমন্ত্রীর নৈশভোজে স্টিকারযুক্ত নিজের গাড়িতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে যোগ দিতে গেলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা বলেন, মাননীয় এমপি স্যার ব্যতীত অন্য কাউকে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আছে। এমপি  ইসরাফিল আলম তখন বলেন,“আমার সাথে সংসদ কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিগত সহকারী আইডি কার্ডসহ এসেছে, ওরা বাজেট সংক্রান্ত কার্যক্রমের প্রক্রিয়ায় অনেক অবদান রাখে। তারা গেলে নিরাপত্তার বিঘœ ঘটবে না”। এর পরেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সম্মতি না দেওয়ায় তিনি তাৎক্ষণিক গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে চলে যান।

এ প্রসঙ্গে ইসরাফিল আলম’কে ফোন করলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার বিবেকবোধকে আহত করেছে। কারণ ওরা তো সংসদের স্টাফ হিসেবেই আমাদের সাথে সার্বক্ষণিক সংসদীয় কার্যক্রমে সহায়তা করে। নিয়মটির পরিবর্তন হওয়া দরকার।” বিষয়টিকে তিনি অমানবিক হিসাবে মন্তব্য করে জানান, আমরা রাষ্ট্রের আইন ও নীতি প্রণয়ন করি। দেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী ও গতিশীল করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টায় একজন ব্যক্তিগত সহকারী ব্যতীত কোন সহায়ক বা কর্মকর্তা পাইনি। তাকেও যদি অমর্যাদা ও উপেক্ষা করা হয় তাহলে তো বিষয়টির অভিঘাত সংসদ সদস্য তথা সংসদকে আক্রান্ত করে। এই বিষয় গুলো সম্পর্কে তো কাউকে না কাউকে, কোন না কোন ভাবে বলতেই হবে-আমি সেই দায়িত্বটি পালন করেছি। আর কিছু না। তিনি আরো বলেন, “ ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী আমাদের সম বা নি¤œ পদমর্যাদার ব্যক্তি/কর্মকর্তারা, গানম্যান, এপিএস, পিএস সহ একাধিক স্টাফ নিয়ে সর্বত্র বা প্রত্যেক সভা-সেমিনারে কিংবা প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে এসব জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত হওয়া প্রয়োজন- কারন এদেশ পিপলস্ রিপাবলিক অব বাংলাদেশ, এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিপাবলিক অব বাংলাদেশ নয়।”

জানা গেছে, এমন প্রতিবাদের ঘটনা শুধু সেদিন নয়, এর আগেও তিনি  এমন নজির রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বছর তিনেক আগে হোটেল সোনরগাঁওয়ে বাটেক্সপো মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে নিয়ে ঢুকতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হলে অনুষ্ঠান বর্জন করেছিলেন। বিজেএমইএ’র তৎকালীন নেতারা এসে তাঁর কাছে বারবার দুঃখ প্রকাশ করেও তাঁকে অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতে পারেননি।

ইসরাফিল আলম বরাবরই একটু ব্যতিক্রম। শ্রম মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান থাকাকালে তিনি কোনোদিনও মন্ত্রণালয়ের বা অধিদফতরের কোনো গাড়ি একটি দিনের জন্যও ব্যবহার করেননি। কারন সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানদের প্রিভিলেসে তার উল্লেখ নেই যদিও অন্যরা একাধিক বাড়ী মন্ত্রনালয় ও অধিদপ্তর থেকে নিয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করে থাকেন। বিজিএমইএ ভবনে মালিক শ্রমিক সম্পর্ক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি। একই টেবিলে বসে একই রকম খাবারের প্রথা তিনিই চালু করেছিলেন। এর আগে বিজেএমই নেতারা শ্রমিকদের সঙ্গে কোনো সভা করলে সরকারী কর্মকর্তা ও মালিকগণ হোটেল সোনারগাঁও এর খাবার এনে খেতেন আর শ্রমিক নেতাদের জন্য বিরিয়ানি বা অন্য রকম খাবার এনে খাওয়াতেন।

সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার পর বিষয়টি প্রত্যক্ষ করে তিনি  ক্ষুদ্ধ হন এবং প্রতিনিধি সভায় নিজে সবাইকে নিয়ে একই রকম খাবারের প্রথা চালু করেন। শ্রম আইন নিয়ে কাজ করাকালীন সময়ে জনাব ইসরাফিল আলম নিজে উদ্যোগী হয়ে বাংলাদেশের সংসদীয় কার্যক্রমের ইতিহাসে প্রথম সংশ্লিষ্ট আইনের ভোক্তাদের মতামত জানতে পাবলিক হিয়ারিং তথা গণশুনানীর প্রচলন চালু করেন।

শেয়ার কেলেংকারি কিংবা ব্যাংক  আর্থিক সেক্টরের বিপর্যয় ঠেকাতে টকশোতে ও সংসদে তিনি অর্থমন্ত্রীকে ছেড়ে কথা বলেননি। দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়িতে তিনি যেমন সমালোচনা করেছেন তেমনি আইনশৃঙ্কলা রক্ষাকরী বাহিনীর সদস্যবৃন্দের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির দাবি তুলেছেন। আবার যখন ২০১৪-তে আগুন সন্ত্রাসে নিহত বা আহত প্রতি গভীর শোকাহত চিত্তে এর তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের পক্ষে কথা বলেছেন।

সংসদ কিংবা সংসদীয় দলের সভায় সত্য, ন্যায়ের পক্ষে তিনি সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। সত্য কথা বলতে তিনি কুন্ঠিত হননি তেমনি তিনি তাঁর বক্তব্য প্রদানেও কোনো সময়েই দ্বিধাবোধ করেননি। মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে টকশোতে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে কথা না বলার জন্য প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি এবং একটি ব্যাংকের পক্ষে বিশাল অংকের টাকার অফার তিনি প্রত্যাখান করে বলেছিলেন, যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে বক্তব্য দিতে  গিয়ে বঙ্গবন্ধুর এই দেশে যদি জঙ্গীদের হামলায় মৃত্যুও হয় তাও তিনি হাসতে হাসতে মেনে নেবেন। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে আইন আমরা সংশোধন করেছি তার পূর্ণ বাস্তবায়ন থেকে এক কেশাগ্র ছাড় দেয়া যাবে না।

ওয়ান ইলেভেনের সময় দলের নেতারা পলাতক ছিলেন, নেত্রীকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন। তখনও জনাব ইসরাফিল আলম দলের পক্ষে, নেত্রীর পক্ষে, নেত্রীর মুক্তি চেয়ে সেনা শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে টিভি চ্যানেলে কথা বলেছেন। নওগাঁ জেলা আওয়ামী পরিবারের পক্ষে চ্যালেন ওয়ানে বলিষ্ঠ বক্তব্য দিয়ে নির্যাতিত হয়েছেন।

আবার সংসদীয় দলের সভায় তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক কিংবা প্রভাবশালী মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও সমালোচনা করে একাধিকবার বক্তব্য রেখেছেন। দলের এসব নেতার কারও কারও কাছে বিরাগভাজন হলেও সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের কাছে প্রশংসিত হয়েছেন এবং ব্যতিক্রমধর্মী  এক পজিটিভ ও ব্যতিক্রমী ইমেজ গড়ে তুলেছেন দেশ-বিদেশে। বাটা সু ও গ্রামীনফোন কোম্পানির কর্মচারীদের চাকুরীচ্যুতি ও অনান্য সুযোগ সুবিধার প্রশ্নে তাকে প্রধান করে সংসদীয় সাব-কমিটি গঠিত হলে তিনি অনেক প্রভাবশালীদের চাপের ও লোভের কাছে মাথা নত না করে নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট ও সুপারিশ দিয়েছেন। পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে জাহাজভাঙ্গা শিল্প পরিদর্শনের সময় ও তিনি সত্য এবং বস্তুনিষ্ঠ রির্পোট প্রদানে পিছু পা হননি। গার্মেন্টস্ শ্রমিকদের মজুরী ও তাদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রশ্নে আবার গার্মেন্টস্ শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রশ্নে তার স্পষ্ট ও সাহসী ভূমিকা সর্বজনবিদিত।

নির্বাচনী এলাকা-৫১ নওগাঁ-০৬ আত্রাই রাণীনগর অর্ধশত বছর ধরে খুন-সন্ত্রাস ও এক অপরাধ প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। নকশাল, সর্বহারা ও জেএমবি অধ্যূষিত এই এলাকাকে সন্ত্রাস মুক্ত করতে কাউকে কোন ছাড় দেন নি। মাদক, বাল্য বিবাহ সহ জঙ্গী বাদের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিরোধী গর্জনে জনজীবনে যে শান্তি ও নিরাপত্তার সুবাতাস তিনি প্রবাহিত করেছেন তাঁর জন্য নিজদল শুধু নয় ভিন্ন মতের রাজনৈতিক ধারার জনগণও তাঁকে শান্তির দূত বলতে কৃপণতা করেন না।

গণমাধ্যম বান্ধব এই এমপি’র টকশো দেখে সর্বস্তরের মানুষই তাকে একজন গ্রহণযোগ্য ও উন্নত চিন্তাধারার রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রশংসা করেন। তবুও রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ-বিপক্ষের ধারা উপধারায় বিভক্ত বহুবাচনিক ও বহুমাত্রিক সমাজে তাঁর বিরুদ্ধে হয়তো বিরোধীতা করার মানুষের শূন্যতা নেই। তার পরেও একজন নেতা ইসরাফিল আলম,একজন শিক্ষানুরাগী ও শিক্ষাবান্ধব রবীন্দ্রভক্ত ইসরাফিল আলম, একজন কন্ঠ শিল্পী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী ইসরাফিল আলম, একজন অহিংস শ্রমিক নেতা ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ ইসরাফিল আলম, একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারীয়ান ইসরাফিল আলমের সংখ্যা আমাদের বাংলাদেশে এই সময়ে কিন্তু খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবেনা। অবজ্ঞা ও মূল্যবোধের সংকটের প্রাচীরে আবদ্ধ বর্তমান সমাজে একজন লেখক, সুবক্তা ও রাজনীতিক ইসরাফিল আলম-এর প্রয়োজন ও আবশ্যকতাই আমাদের মত সাধারণ মানুষের অনুভূতিকে নাড়া দেয়।

শেয়ার করুনঃ

No Comments

Leave a Comment